প্রকাশিত: Sat, Jul 8, 2023 8:04 AM
আপডেট: Mon, Jan 26, 2026 7:58 AM

রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ শান্তির চাবিকাঠি!

প্রবীর বিকাশ সরকার  : আমি টোকিওর ২৩টি ওয়ার্ডের একটি ওয়ার্ড কাৎসুশিকার একটি শহরে থাকি, যা কুমিল্লা শহরের তিনগুণ বড়। যাকে ডাউন টাউন বা উপশহর বলা যায়। প্রায় ৪০ বছর হতে চললো এই শহরে। ৪০ বছর আগে অবশ্যই এমন ছিলো না এই শহরটি। পুরনো কাঠের বাড়িঘর, কলকারখানা, অপরিচ্ছন্ন কাচাবাজার, বাস স্টপেজ, সরু রাস্তা, এখানে সেখানে জংলা, অপরিচ্ছন্ন উদ্যান, ময়লা-দুর্গন্ধযুক্ত নর্দমা-নালা। যত্রতত্র মানুষের ভিড়, হৈহল্লা। সকাল-বিকাল ইয়াকুজা তথা মাফিয়াদের চ্যালা চিনপিরা বা মাস্তানদের রাজত্ব, চাঁদাবাজি, জোরপূর্বক বিনাপয়সায় রেস্টুরেন্টে খাওয়া, ঘণ্টার পর ঘণ্টা চেয়ার-টেবিল দখল করে আড্ডা দেয়া প্রতিদিনকার দৃশ্য ছিলো। আমি তখন ছাত্র। চারতলার সবচেয়ে উপরে একটি ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টে থাকি। সেইসময় সবচেয়ে বেশি উত্যুক্তকর ছিলো বোওসোওজোকু/বোওজোওজোকু অর্থাৎ মোটরসাইকেল গ্যাং, কিশোর গ্যাংএর সকাল-বিকাল এবং গভীর রাতের উৎপাত। ফ্যাশনাবল কিশোরের দল ভট ভট কর্ণবিদীর্ণকরা শব্দে বাইক চালিয়ে শহরকে মাথায় তুলে রাখত। এরা ছিলো তখন উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি জাপানের বখে যাওয়া কিশোর প্রজন্ম। পুলিশ, মেয়র, কমিশনার কাউকেই এরা তোয়াক্কা করত না। 

আমার বাসার সামনেই ছিলো এলিভেটেড রেলের নিচে খালি জায়গা, সেখানে তারা সশব্দে এসে জড়ো হতো আর সারারাত নাচানাচি, রক-পপ গানে মেতে থাকত। পুলিশ এসে তাড়িয়ে দেয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করত। কিন্তু কোনো কর্ণপাত করত না এরা। বরং পুলিশকে বিশ্রী ভাষায় গালিগালাজ করত। আমি বারান্দা থেকে দেখতাম এই দৃশ্য। ঘুমুতেই পারতাম না। অথচ সকালবেলা উঠে যেতে হবে স্কুলে। আমার মতো প্রতিবেশীরাও এই উৎপাত সহ্য করেছেন। জাপানিরা যে কত সহ্যগুণের অধিকারী। কত ধৈর্যশীল তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আমি তিনবছর পর স্কুল শেষে এই শহরেই বসত গাড়লাম, সংসার স্থাপন করলাম। তখন এই পুরো ওয়ার্ডে হাতেগোনা কয়েকজন বাংলাদেশি শ্রমিক ছিলো। একমাত্র আমিই স্থানীয় জাপানি মেয়েকে বিবাহ করার কারণে জাপানিদের সঙ্গে মেলামেশার দারুণ সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিলো। অধিকাংশ জাপানি নাগরিকই তখন বাংলাদেশ বলতে কোনো দেশ আছে এই গ্রহে তারা জানতই না। আমি পরিচয় দিতাম বেশ বুক ফুলিয়েই। যারা কিছুটা জানত আমাকে পত্রপত্রিকা দেখিয়ে বলত, এই দেশের ছেলে তুমি। বন্যা-মহামারি, রাজনৈতিক খুনাখুনি, যৌতুকের বলি, বস্তির জীবনযাপন নিয়ে প্রায়শ খবর ছাপা হতো। টিভি চ্যানেলগুলোতে মাঝে মাঝে প্রতিবেদন প্রদর্শন করত বাংলাদেশ নিয়ে। লজ্জা হতো, দুঃখ হতো। মুখ দেখানো কঠিন ছিলো সেইসময়টা, যা ২০১০ সাল পর্যন্ত সুদীর্ঘ ছিলো। আমি জাপানের যুদ্ধোত্তর ইতিহাস জানতাম তাই বলতাম, জাপানও এইরকম ছিলো ৫০ দশক থেকে। এখনো তো উন্নতির বাকী আছে, আছে না কী? তারা হেসে সেটা স্বীকার করতেন। 

একবার, সম্ভবত, ১৯৮৮ সালের কথা। কাৎসুশিকা ওয়ার্ডের মেয়র রাজনীতিবিদ আওকি স্যার শহর ঘুরতে বের হলেন ছুটির দিনে। নিজ হাতে কমিশনারদের নিয়ে আংকেত বা মতামত-জরিপ করতে প্রশ্নপত্র বিলি করছিলেন স্টেশনে। আমাকেও দিলেন। আমি জাপানি ভাষায় তাঁকে ধন্যবাদ দিলাম। তিনি অবাক হয়ে হাত বাড়িয়ে করমর্দন করলেন এবং বললেন, এই শহরের উন্নয়ন এবং পরিবেশ কীভাবে বাসযোগ্য করা যায় তোমার মতামত জানাতে পার কি? আমি বললাম, এখন তো সময় নেই। একটি মিটিংএ যাচ্ছি। তবে আমি মনে করি, শুধু এই ওয়ার্ডই নয়, সমগ্র জাপানের সব সমস্যার সমাধান আছে রাজনৈতিক সংস্কারের মধ্যে। এর বিকল্প নেই। মাচিজুকুরি তথা শহর গড়েতোলা, রাস্তাঘাট দুর্ঘটনামুক্ত, মাফিয়া-বোওসোওজোকু নিয়ন্ত্রণ এসব রাজনৈতিকভাবে পরিকল্পনাধীনে করা সম্ভব। ভেবে দেখতে পারো। রাজনীতিকরা নিজেদের স্বার্থের জন্য প্রশ্রয় দিচ্ছে বলেই এইসব সমস্যা দূর হচ্ছে না। 

মেয়র এবং তাঁর পাশে থাকে কমিশনাররা এক বিদেশির কথা শুনে চমকে উঠলেন। মেয়র বিনম্রভাবে মাথা নুইয়ে বললেন, নারুহোদো (আচ্ছা, তাই)। অবশ্যই চিন্তা করব আমরা। তোমাকে অনেক ধন্যবাদ। এই ঘটনার পর জানি না কী হয়েছিলো, ব্যস্তজীবনে কে অতো খোঁজখবর রাখে। ৬ মাস পর রেললাইনের খালি জায়গায় শক্ত তারের বেড়া দিয়ে দিলো রেল কোম্পানির লোকেরা এসে। একটি নোটিশ ঝুলিয়ে দিলো, এখানে দাঁড়ানো যাবে না। কোনো প্রকার আড্ডা চলবে না। সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ! অন্যথায় উচ্চমূল্যের জরিমানা ধার্য করা হবে। ব্যস! কল্লা ফতে। কিশোর গ্যাং এসে চিল্লাচিল্লি করলো তারপর আর আসেনি। শান্ত হয়ে গেলো পরিবেশ। শান্তির ঘুম নামলো চোখে। এরপর দ্রুত পুরো কাৎসুশিকা ওয়ার্ডের কোথাও বোওসোওজোকু নেই। কোথায় গেলো? রাজপথেও ভট ভট শব্দ নেই। পরে একদিন জেনেছিলাম, মেয়র জরুরি সভা ডেকেছিলেন দপ্তরে। সব দলের রাজনীতিবিদ, নগর ও জাতীয় সংসদের স্থানীয় সাংসদদের আমন্ত্রণ জানালেন। কী কারণ এইসব সমস্যার? কী সমাধান? উত্তরে সবাই বললেন, অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন জমা দেবেন। 

তিনমাসের মধ্যে প্রতিবেদনে জমা দিলে দেখা গেলো, রাজনৈতিক স্বার্থ, অবজ্ঞা আর প্রশ্রয়ের কারণে শহর অনুন্নত, আইনকানুন অবমাননা, শহর নোংরা করা, মাফিয়াগিরি, চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাংএর উৎপাতের মূল কারণ। মেয়র কঠোর হলেন, আদেশ জারি করলেন, সংস্কার জরুরি। কৃতকর্মের কৈফিয়ত এবং জরিমানা ধার্য করলেন। ফলে দ্রুত বদলে যেতে লাগল অবস্থা, পরিবেশ এবং দুর্নীতির চিত্র। মাত্র বিশ বছরেই বৈপ্লবিক পরিবর্তন দেখা দিতে লাগলো জাপান জুড়ে। প্রথমেই আইনকানুন ও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলো রাজনীতিবিদের ক্ষমতা হ্রাস, মাফিয়ার সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ, ঘুষ, তদবির একদম নিষিদ্ধ। অন্যথায় জবাবদিহি ও জরিমানা। আজকে জাপান কতখানি শান্তি ও নিরাপদ সর্বত্র তার ব্যতিক্রম নয় আমার শহরটিও। নির্বিঘ্নে হাঁটি আর সৌন্দর্য ছুঁয়ে দেখি। বাংলাদেশকে জাপান থেকেই শিক্ষা নিতে হবে এবং এখনই। লেখক ও গবেষক